সোমবার , 17 ডিসেম্বর 2018

মাটি পরীক্ষার জন্য মাটির নমুনা সংগ্রহ পদ্ধতি

মাটির নমুনা

মাটির নমুনা হলো কোন জমি হতে সংগৃহীত কিছু পরিমাণ মাটি যা ঐ জমির মাটির গুণাবলির প্রতিনিধিত্ব করে। মাটি হলো ফসলের খাদ্য ভান্ডার। কিন্তু অপরিকল্পিত ব্যবহারের কারণে মাটির উর্বরতা শক্তি ক্রমেই কমে যাচ্ছে। ফলে ফসলের ফলন ও উৎপাদন আশানুরুপ হচ্ছে না। এমতাবস্থায় প্রয়োজন মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ করা। এজন্য মাটির উর্বরতা সংরক্ষণসহ ফসলের কাঙ্খিত ফলন কৃদ্ধির জন্য মাটি পরীক্ষা করে সুষম সার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তাই মাটি পরীক্ষার জন্য সঠিক পদ্ধাতিতে মাটির নমুনা সংগ্রহ করা অত্যাবশ্যক। এ লক্ষ্যে শুধু কর্ষণ স্তরের মাটি সংগ্রহ করতে হবে।

মাটির নমুনা সংগ্রহের উদ্দেশ্য

  • মাটিতে কি পরিমাণ পুষ্টি উপাদান আছে তা জানা।
  • পুষ্টি উপাদানের ভিত্তিতে ঐ মাটিতে কি পরিমাণ সার প্রয়োগ করতে হবে তা নির্ণয় করা।
  • সর্বোপরি মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করা।

মাটির নমুনা সংগ্রহের উপকরণ

কোদাল (চিত্র-১)

কোদাল

প্লাস্টিকের বালতি (চিত্র-২)

বালতি

ছুরি (চিত্র-৩)

ছুরি

পলিথিন শীট (চিত্র-৪)

পলিথিন

মোটা পলিথিন ব্যাগ (চিত্র-৫)

পলিথিন

সুতলী (চিত্র-৬)

লেবেল বা ট্যাগ (চিত্র-৭)

নমুনার জন্য একটি প্লটের কতটি স্থান হতে মাটি সংগ্রহ করতে হবে ?

৯ টি স্থান

প্লটের কোন্ কোন্ স্থান হতে নিতে হবে ?

  • জমির সীমানা হতে ৪-৬ হাত ভিতরে চার কোণা থেকে ৪টি। (উল্লেখ্য, প্লটের আকার হিসেবে এই দুরত্ব বাড়তে বা কমতে পারে।)
  • এবং চারকোনা হতে নেয়া স্থানের মাঝখান হতে আরও ৪টি। এছাড়া জমির মধ্য হতে ১টি। (চিত্র-৮)

সতর্কতা

  • জমির আইলের একবারে নিকট হতে মাটি সংগ্রহ করা যাবে না।
  • কারণঃ সাধারণত প্রতি বছর আইলের পাশ হতে মাটি তুলে আইলে দেয়া হয়। অথবা আইলের মাটি পঁচা ঘাসসহ আবার আইলের পাশে জমা হয়।

কিভাবে মাটি সংগ্রহ করতে হবে

  • কোদাল দিয়ে যেকোন এক দিকে কোপ দিতে হবে। (চিত্র-৯)

  • তারপর বিপরীত দিক দিয়ে আরেকটি কোপ দিয়ে মাটি ফেলে দিন। এ অবস্থায় অনেকটা ইংরেজি “V” আকৃতির মতো হবে। (চিত্র-১০,১১)

  • এবার যেকোন এক পাশে ৩-৪ ইঞ্চি পুরু করে আরেকটা কোপ দিতে হবে। (চিত্র-১২)

  • এবার কোদালে থাকা সমস্ত মাটি তুলে আনতে হবে। (চিত্র-১৩, ১৪)

  • মাটির খন্ড থেকে পরীক্ষার মাটি সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে খন্ডের দুই পাশের মাটি ছুরি দিয়ে কেটে ফেলতে হবে। (চিত্র-১৭, ১৮)

  • কর্ষণস্তরের মাটি (শুধু চাষ স্তর) সংগ্রহের জন্য ছুরি দিয়ে মাটিতে খুচিয়ে দেখতে হবে মাটির চাষ স্তরের নিচে কোন স্তর তুলনামূলক শক্ত। ঐ শক্ত শক্ত স্তরকে কর্ষণ তল বলে। আমাদের মাটি এই কর্ষণ তলের উপর থেকে শুধুমাত্র কর্ষণস্তর থেকে নিতে হবে। (চিত্র-১৯)

  • এবার আমরা পাব চার কোণা বিশিষ্ট একটি মাটির খন্ড। (চিত্র-২১)

  • এই খন্ডটিকে এবার আমরা বালতিতে রাখবো (চিত্র-২২)

  • একইভাবে আরও ৮ জায়গা হতে নিতে হবে।

 

কোন্ কোন্ জায়গা হতে মাটি নেয়া যাবে না

রাস্তা বা বাঁধের পাশ হতে, যেখান হতে ইতি মধ্যে মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। (চিত্র-২৩)

গোবর/কম্পোষ্ট ফেলানো আছে এমন জায়গা হতে (চিত্র-২৪)।

পরিত্যক্ত ইটের ভাটা বা যেখানে মাটির মধ্যে ইট বা পোড়া মাটির অংশ আছে (চিত্র-২৫)।

নাড়া পোড়ানো অংশ হতে (চিত্র-২৬)।

মানুষের চলাচলের পথ হতে (চিত্র-২৭)।

জমির মধ্যে কোনও জায়গায় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি গাছ বা আগাছার বৃদ্ধি দেখা গেলে (চিত্র-২৮)।

এক্ষেত্রে নির্ধারিত স্থান হতে একটু সরে গিয়ে মাটি নিতে হবে।

 

মাটি সংগ্রহোত্তর কার্যাবলী

মাটি পলিথিনের উপর মেলে দিতে হবে (চিত্র-২৯)।

যদি মাটির খন্ড বড় হয় তাহলে হাত দিয়ে ভেঙ্গে দিতে হবে (চিত্র-৩০)।

ছায়াযুক্ত স্থানে শুকাতে দিতে হবে। রোদে শুকানো যাবে না (চিত্র-৩১)।

মাটি শুকিয়ে গেলে কাঠের মুগুর দিয়ে মাটি গুড়া করতে হবে (চিত্র-৩২)।

এ পর্যায়ে আগাছা, উদ্ভিদের অবশিষ্টাংশ ইত্যাদি ফেলে দিতে হবে (চিত্র-৩৩)।

এবার মাটি স্তুপ করতে হবে (চিত্র-৩৪, ৩৫)।

এ পর্যায়ে মাটি ভালকরে দু’হাত দিয়ে মেশাতে হবে (চিত্র-৩৬) ।

  • ৯ জায়গা হতে মাটি সংগ্রহ করলে প্রায় ৮-৯ কেজি মাটি সংগ্রহীত হবে । কিন্তু মাটি পরীক্ষায় প্রয়োজন ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম মাটি। তাই এই ৮-৯ কেজি মাটি হতে মাটি কমিয়ে ৪০০-৫০০ গ্রাম করতে হবে।

মাটির পরিমাণ কমানোর পদ্ধতি

এজন্য মাটি মেলে দিতে হবে (চিত্র-৩৭)।

আঙুল দিয়ে কোণাকুনি দু’টি দাগ দিতে হবে (চিত্র-৩৮)।

এরপর দুই বিপরীত কোনার মাটি ফেলে দিতে হবে (চিত্র-৩৯, ৪০)।

পরের বার উল্টো দিকের দুই কোণার মাটি ফেলে দিতে হবে (চিত্র-৪১, ৪২)।

যতক্ষণ না মাটি ৪০০-৫০০ গ্রামে না আসে ততক্ষণ এই পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে।

এবার পাঠানোর প্রস্তুতি

মাটিকে এবারে পরিস্কার পলিথিনে ভরতে হবে (চিত্র-৪৫)।

তারপর পলিথিনের বাতাস বের করে দিয়ে মুখ বেঁধে দিতে হবে (চিত্র-৪৭)।

ঐ মাটি ভরা পলিথিনকে আরও একটি পরিস্কার পলিথিনের মধ্যে নিতে হবে (চিত্র-৪৮,৪৯)।

এবার নমুনার পরিচিতি প্রদান

মাটি ভর্ত্তি পলিথিনের সাথে পরিচিতি (লেবেল/ট্যাগ) প্রদান করতে হবে। এছাড়া,

ট্যাগে ফসল সংক্রান্ত আরও কিছু তথ্য প্রদান করতে হবে। আসুন দেখে নিই লেবেল/ট্যাগে

কী কী তথ্য প্রদান করতে হবে । একটি পূরণকৃত নমুনা ট্যাগের ছবি দেয়া হলো (চিত্র-৫০)।

এবার দুই পলিথিনের মাঝে ট্যাগটি দিয়ে দিতে হবে (চিত্র-৫১, ৫২) ।

এরপর আবার পলিথিনকে আবার বাঁধতে হবে (চিত্র-৫৩)।

ভিতরে যে ট্যাগ বাইরে একই ট্যাগ আরেকটা সুতলির সাথে বেঁধে দিতে হবে (চিত্র-৫৪)।

মাটির নমুনা পাঠানোর ঠিকানা

  • আপনার নিকটস্থ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের আঞ্চলিক/কেন্দ্রীয় গবেষণাগার, জেলা/আঞ্চলিক কার্যালয়।
  • আপনার এলাকার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা অথবা উপজেলা কৃষি অফিস।
  • এছাড়া, ভ্রাম্যমান মৃত্তিকা পরীক্ষাগারে (এলাকায় উপস্থিত থাকলে)।

মাটি পাঠানোর পর আপনি পাবেন একটি সার সুপারিশ কার্ড (চিত্র-৫৫) । যা’তে পুষ্টি উপাদানের মাত্রা, শ্রেণী এবং আপনার বর্ণিত ফসলের সারের মাত্রা উল্লেখ থাকবে।

সার সুপারিশ কার্ড প্রাপ্তির পরবর্তী করণীয়

কার্ডটি যত্নসহকারে সংরক্ষন করতে হবে, কারণ একবার মাটি পরীক্ষা করালে ৫ বছর পর্যন্ত সারের ঐ মাত্রা ব্যবহার করা যাবে।

সারের পরিমাণ গ্রাম/শতক হতে জমির পরিমাণ অনুযায়ী বের করে নিতে হবে।

কখন মাটির নমুনা সংগ্রহ করতে হবে ?

মাটির নমুনা সংগ্রহের উপযুক্ত সময়

  • বোরো/আমন ধান কাটার পর
  • অথবা যেকোন ফসল উত্তোলনের পর (চিত্র-৫৬)

  • সার প্রয়োগের ২৫-৩০ দিনের মধ্যে কখনোই মাটি পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা উচিৎ নয়

মাটি পরীক্ষা করতে কত খরচ ?

কৃষকদের ক্ষেত্রেঃ

  • মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট কর্তৃক পরিচালিত ভ্রাম্যমান মাটি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করালে ২৫/=
  • স্থায়ী গবেষণাগারে করালে ৫০-৭০/= (প্রয়োজনীয় ৯ টি উপাদান)

এনজিও/অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেঃ

সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ফি। এ জন্য সরাসরি “মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট” এ যোগাযোগ করতে পারেন।

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes