সোমবার , 17 ডিসেম্বর 2018

নারিকেলের মাকড় আক্রমণ ও তার প্রতিকার

মাকড় পরিচিতি

  • নারিকেলের মাকড় আমাদের দেশে একটি নতুন সমস্যা ইতোপুর্বে কৃষক নারিকেলের মাকড় এবং মাকড়ের ক্ষতির ধরণ কী তা দেখেন নাই
  • মাকড় নিয়ে অনেক গুজব ও কুসংস্কার ছড়াতে থাকে ফলে দীর্ঘদিন ধরে মাকড় অনাবিষ্কৃত থেকে যায়
  • অনুমান নির্ভর দমন ব্যবস্থাপনা অবলম্বন করে কোন সুফল না পাওয়ার কারণে সাধারণ লোকের ধারণা জন্মেছিল যে, মোবাইল টাওয়ারের জন্য বড় হবার আগেই নারিকেল শুকিয়ে যাচ্ছে।
  • পৃথিবিতে প্রায় আট হাজার প্রকারের মাকড় আছে
  • সব মাকড় খালি চোখে দেখা যায়না

নারকেলের মাইট

  • নারিকেলের ফলে আক্রমণ করে এক ধরণের ক্ষুদ্র মাকড় যা খালি চোখে দেখা যায় না
  • সাধারণ মাকড়ের ৮ পা থাকলেও নারিকেল আক্রমণকারি মাকড়ের আছে ৪ পা
  • মাকড়ের পা দেহের তুলনায় লম্বা হলেও নারিকেলের মাকড়ের পা হয় খাট
  • লম্বাটে দেহের সামনের দিকে মুখের কাছে পা অবস্থিত
  • এসব মাকড়ের দেহ স্বচ্ছ বর্ণ হীন বা লালচে বর্ণের। সাধারণ অণুবিক্ষণ যন্ত্রে এদের সহজে খুজে পাওয়া যায় না।
  • এরা উড়তে পারে না এবং পায়ে হেটে বেশি দুরে যেতে পারে না
  • বাতাস, পাখি বা কীট- পতঙ্গের মাধ্যমে একগাছ থেকে অন্য গাছে ছড়ায়।

মাকড়ের ইতিহাস

  • ১৯৬৫ সালে মেক্সিকো এর গ্রীরোনিচ শহরে নারিকেলে মাকড়ের আক্রমন দেখা দেয়
  • উপমহাদেশের শ্রীলংকাতে ১৯৯৭ সালে প্রথম মাকড়ের আক্রমন দেখা দেয়
  • ভারতের কেরালা রাজ্যে ২০০০ সালে নারিকেলে মাকড় আক্রমন দেখা দেয়
  • ২০০৪ সালের দিকে বাংলাদেশে যশোর অঞ্চলে এ রোগ প্রথম দেখা যায়
  • আমাদের দেশে কৃষক আগে কখনো নারকেলে মাকড় আক্রমন দেখেননি বা শোনেননি-তাই আক্রমনের শুরুতে মাকড় অজানা থেকে যায়।
  • অনেকে ধারণা মোবাইল ফোনের টাওয়ারের কারণে নারিকেলে এমনটি হচ্ছে
  • এভাবে ২০০৮ সাল পর্যমত্ম মাকড় বাংলাদেশে অনাবিষ্কৃত থেকে যায়।
  • ফল ছাড়াও এমন অনেক মাকড় আছে যা নারিকেলের পাতায় আক্রমণ করে।
  • কম বয়সের গাছেই পাতা আক্রমণকারী মাকড় বেশি দেখা যায়।

মাকড়ের জীবন কাল

  • মাকড়ের জীবনকাল ৭-৯ দিন
  • ডিম ফুটে বের হতে সময় লাগে ৩ দিন
  • জন্মের পরপরই এরা নারিকেলের রস চুষে খাওয়া শুরু করে
  • পূর্ণ বয়স্ক মাকড়ে পরিণত হতে আরও ৩ দিন সময় লাগে
  • পরবর্তি ৩ দিন এরা বংশ বিস্তার করে
  • ক্ষুদ্রাকৃতি এসব মকড় কচি ডাবের বোঁটার কাছে বৃতির নিচে থেকে দলবদ্ধ ভাবে রস চুষে খায়
  • আক্রান্ত গাছের মরা খোলে, পাতায়, কাঁন্দি, মোচায় এদের ডিম থাকে।

মাকড় আক্রমনের লক্ষণ

  • মাকড়, আক্রান্ত নারিকেলের বোটার কাছ থেকে খোলের উপর আঁচড়ের মত ফাটা বাদামী দাগ পড়ে

  • এসব ফাটা স্থান দিয়ে আঠালো পদার্থ বের হয়। ফলে কচি ডাবের খোঁসা আক্রান্ত হয়ে বাদামী হয়ে যায়
  • আক্রান্ত নারিকেল আকারে ছোট ও শক্ত হয়ে যায়
  • ২ মাস বয়সের নারিকেল বেশি আক্রান্ত হয় এবং ছয় মাস বয়স পর্যন্ত এরা আক্রান্ত ফল হতে রস চুষে খায়
  • নারিকেলের বয়স ছয় মাস বা তার বেশি হলে অপেক্ষাকৃত কঁচি ফলে চলে যায়
  • তীব্র আক্রমন হলে গাছ নারিকেল শুন্য হয়ে পড়ে। এ সময় খাদ্যের সন্ধানে মাকড় গাছের কচি পাতায় চলে যায়।
  • কাঁদিতে নারিকেলের বয়স দুই মাস হলে মাকড় আক্রমন করে
  • ৩-৪ মাস বয়সের নারিকেলে মাকড় সব চেয়ে বেশী থাকে

আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে নারিকেলে মাকড়র আক্রমনের ফলাফল

  • বাংলাদেশে নারিকেল উৎপন্ন হয় কৃষকের বাড়ির আঙিনায়
  • উৎপাদনকারী বেশীর ভাগ কৃষকই ভূমিহীন , ক্ষুদ্র বা প্রান্তিক চাষী
  • পৃথিবীতে তেল তৈরীর জন্য নারিকেল উৎপাদন হলেও বাংলাদেশে নারিকেল উৎপাদন হয় ফল ও কঁচি ডাব হিসেবে খাওয়ার জন্য।
  • নারিকেল ছোবড়ার আঁশ থেকে দড়ি, মালা থেকে বোতাম ও নানান ধরণের ব্যবহার যোগ্য দ্রব্য সামগ্রী তৈরী হয়।

ক্ষতির পরিমাণ

  • মাকড়ের আক্রমনে নারিকেলর উৎপাদন কমেছে ১৫-২৫%
  • আকামত্ম গাছে দাগ ওয়ালা ও দাগমুক্ত স্বাভাবিক আকৃতির নারিকেল আকারে ছোট হয়ে থাকে।
  • দাগ বিহীন হলেও ছোট নারিকেলের বাজার মূল্য কম।
  • আক্রান্ত নারিকেল দাগ পড়া হলেও যদি বড় আকারে হয় তা স্বাভাবিক নারিকেলের দামেই বিক্রি করা যায়।
  • দাগ যুক্ত ফাটা ও বিকৃত নারিকেল বিক্রির অনুপযোগী হয়ে থাকে।
  • মাকড় আক্রান্ত নারিকেলের খোঁসা ভাল হয়না বলে তা দিয়ে দড়ি তৈরী করা যায় না
  • আক্রান্ত গাছের ২৫% পর্যন্ত নারিকেল বিক্রির অনুপযোগী হয়ে থাকে
  • দাগমুক্ত ও দাগযুক্ত ছোট আকারের নারিকেল বড় নারিকেলের অর্ধেক মূল্যে বিক্রি হয়
  • এ হিসেবে আর্থিক ক্ষতির পরিমান দাঁড়ায় ৭০-৮০%

মাকড় দমন

  • বেশিরভাগ মাকড়ই একে অপরের শত্রু
  • অনেক কীট-পতঙ্গও মাকড় খেয়ে বাচে। তাই প্রাকৃতিক ভাবেই মাকড় নিয়ন্ত্রন হয়ে থাকে। মাকড় নাশক দিয়েও মাকড় দমণ করা যায়
  • ফলের বোটার বৃতির নিচে বাসা বাঁধে বলে এরা সরাসরি মাকড় নাশকের সংস্পর্শে আসে না আবার প্রাকৃতিক শত্রুও এদের খুজে পায় না। তাই মাকড় দমন বেশ কঠিন
  • নির্বিচারে কীট-নাশক ব্যবহার করলে পোকা মরে ফলে মাকড়ের আক্রমন বৃদ্ধি পায়।

  • প্রথম ধাপ
    ১। আক্রান্ত গাছের ফুল সহ ৬ মাস বয়স পর্যন্ত সকল ফল কেটে আগুনে ঝলসাতে হবে ২। অতঃপর গাছের মাথায় কাঁদি সংলগ্ন এলাকায় ওমাইট ১.৫ মিলি বা ভার্টিমেক নামক মাকড়নাশক ১.৫ গ্রাম/লিটার পানিতে মিশায়ে কঁচি পাতা সহ স্প্রে করতে হবে। ৩। শীতের আগে আক্রান্ত গাছের ফুল সহ ৬ মাস বয়স পর্যন্ত সকল ফল কেটে আগুনে ঝলসাতে হবে
    দ্বিতীয় ধাপ
    ৪। অতঃপর গাছের মাথায় কাঁদি সংলগ্ন এলাকায় ওমাইট ১.৫ মিলি বা ভার্টিমেক নামক মাকড়নাশক ১.৫ গ্রাম/লিটার পানিতে মিশায়ে কঁচি পাতা সহ স্প্রে করতে হবে।
    তৃতীয় ধাপ
    ৫। প্রথমবার স্প্রে করার পর গাছে ফল আসলে সেই ফলের বয়স ২ মাস হলে দ্বিতীয়বার স্প্রে করতে হবে।
    চতুর্থ ধাপ
    ৬। গাছে সংগ্রহ কারার উপযোগী ডাব/নারিকেল থাকলে তা সংগ্রহ করে আগের নিয়মে আবার স্প্রে করতে হবে
    পঞ্চম ধাপ
    ৭। চতুর্থ ধাপের মত আশে-পাশের তরুন ও ছোট গাছ সহ নির্দিষ্ট গাছগুলোতে শেষবারের মত মাকড়নাশক স্প্রে করতে হবে

    তথ্যসূত্র: বিএআরআই।

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes