সোমবার , 17 ডিসেম্বর 2018

মাঠ পর্যায়ে ভেজাল সার চেনার উপায়

আধুনিক কৃষি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় রাসায়নিক সার একটি অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ । ষাট দশকের শুরু থেকে রাসায়নিক সারের ব্যবহার শুরু হয় যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে । বিপুল সংখ্যক সারের মধ্যে এক শ্রেণীণ অসাধু ব্যবসায়ী ভেজাল সার উৎপাদন ও বিপণনের মাধ্যমে সাধারণ কৃষককে প্রত্যারিত করে আসছে । ফলে কৃষি কাজে এ সকল সার ব্যবহার করে একদিকে যেমন কৃষক অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন অপরদিকে প্রতারিতও হয়েছেন । জমির উর্বরতা ও ফসলের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার জন্য এ সকল ভেজাল সার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে আসছে বা করে থাকে । তাই মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন সংস্থা সারের গুণগতমাণ নিয়ন্ত্রণের জন্য সারের নমুনা পরীক্ষার জন্য সারের নমুনা নিয়মিতভাবে সরকার বিনির্দিষ্ট গবেষণাগারে প্রেরণ করে থাকে । ভেজাল সার নিশ্চিতভাবে চেনার উপায় হচ্ছে গবেষণাগার বা পরীক্ষাগারে রাসায়নিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সারেরর সঠিক উপাদানের পরিমাণ সনাক্ত করা । পরীক্ষাগারে সার পরীথক্ষার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে ভেজাল সার সনাক্ত-করণ প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে । এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে মৃত্তিকা সম্পদ উননয়ন ইনস্টিটিউট তার দীর্ঘ দিনের সারের নমুনা পরীক্ষার অভিজ্ঞতা, পর্যাবেক্ষণ ও গবেষণালব্ধ ফলাফল বিশ্লেষণ করে মাঠ পর্যায়ে ভেজাল সার সনাক্তকরণের কতিপয় সহজ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে । গবেষণাগারে রাসায়নিক বিশ্লেষণ ছাড়াও কিছু সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করে সংশিষ্ট সারের বিশুদ্ধতা সর্ম্পকে ধারণা লাভ করা সম্ভব । এই সহজ পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রগতিশীল কৃষক অতি সহজেই ভেজাল সার চিহ্নিত করতে সক্ষম হবেন । এ প্রকাশনায় বিভিন্ন ভেজাল সার সনাক্তকরণের কিছু সহজ পদ্ধতি বিভিন্ন প্রকার ভেজাল সারের প্রকৃতি ও ধরণ সর্ম্পকে ধারণা প্রদান করা হয়েছে । মাঠ পর্যায়ে ভেজাল সার সনাক্তকরণের জন্য খুব সামান্য উপকরর প্রয়োজন । এবং এর জন্য তেমন কোন বাড়তি খরচের প্রয়োজন হয় না । এ সকল উপকরণ স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব । এবার আমরা জানবো ভেজাল সার চেনার সহজ উপায়।

ভেজাল ইউরিয়া সার সনাক্তকরণের পদ্ধতি

১ চা চামচ (প্রায় ১ গ্রাম) ইউরিয়া সার ২ চা চামচ পরিমাণ পানির মধ্যে দিলে তাৎক্ষনিকভাবে চলে সচ্ছ দ্রবণ তৈরী করবে । এ দ্রবণে হাত দিলে ঠান্ডা অনুতুত হবে । যদি ইউরিয়া সারে চুন মিশ্রিত থাকে তবে ঝাঝালো গন্ধযুক্ত- অ্যামোনিয়া গ্যাস উৎপন্ন করবে । এটাই দ্রুত নাইট্রোজেন সার চেনার একমাত্র উপায়।

ভেজাল টিএসপি সার চেনার উপায়

  • প্রকৃত টিএসপি সারে অমল স্বাদ যুক্ত ঝাঁঝালো গন্ধ থাকবে। কিন্তু ভেজাল টিএসপি সারে অমল স্বাদ যুক্ত ঝাঁঝালো গন্ধ থাকবে না। জিহবা দ্বারা স্বাদ নিলে অম্ল (টক) স্বাদ অনুভূত হবে।
  • ১ চা চামচ টিএসপি সার আধা গস্নাস ঠান্ডা পানিতে মিশালে সার সম্পূর্ণ দ্রবীভূত হয়ে ডাবের পানির মত পরিষ্কার দ্রবণ তৈরী করবে, পক্ষান্তরে ভেজাল টিএসপি সার পানিতে মিশালে ঘোলা দ্রবণ তৈরী করবে। (চিত্র – নিচে)
  • প্রকৃত টিএসপি সার অধিক শক্ত বিধায় দুটো বুড়ো আঙগুলের নখের মাঝে রেখে চাপ দিলে সহজে ভেংগে যাবে না কিন্তু ভেজাল টিএসপি অপেক্ষাকৃত নরম হওয়ায় দুটো বুড়ো আঙগুলের নখের মাঝে রেখে চাপ দিলে সহজে ভেংগে যাবে।
  • ভেজাল টিএসপি সারের ভাংগা দানার ভিতরের অংশের রং বিভিন্ন রকমের হতে পারে।

চিত্র- আসল ও ভেজাল টিএসপি সার

ভেজাল ডিএপি সার সনাক্তকরণের পদ্ধতিঃ

  • ১-২ চা চামচ পরিমাণ ডিএপি সার একটি কাগজের উপর খোলা অবস্থায় ১-২ ঘনটা রেখে দিলে যদি সারের নমুনাটি ভিজে না উঠে তবে ধরে নিতে হবে যে নমুনাটি ভেজাল ডিএপি সার।
  • প্রকৃত ডিএপি সারে নাইট্রোজেন বিদ্যমান থাকায় বায়ুমন্ডল থেকে আর্দ্রতা শোষণ করে কিছুক্ষণের মধ্যে ভিজে উঠে।
  • আধা চা চামচ মান সম্পন্ন ডিএপি সার ( প্রায় ১ গ্রাম) একটি টেস্ট টিউবে নিয়ে এতে ১ চা চামচ পরিমাণ পানি ধীরে ধীরে ঢাললে এ সারের একটি অংশ গলে যাবে। অবশিষ্ট অদ্রবণীয় অংশ টিউবের নীচে জমা হবে। এখন ১ মিলিলিটার পরিমাণ (৩০-৩৫ ফোঁটা) গাঢ় নাইট্রিক এসিড যোগ করলে অধিকাংশ অদ্রবণীভূত পদার্থ বাদামী রঙ এর অর্ধ সচছ দ্রবণ তৈরী করবে।
  • ১ চা চামচ মান সম্পন্ন ডিএপি সার আদা গ্লাস পানিতে মিশালে তা গ্লাসের তলায় জমা হবে। এতে আধা চামচ বেরিয়াম ক্লোরাইড মেশালে তা গ্লাসের তলায় জমা হবে। ভেজাল ডিএপি সারে যদি গন্ধক মিশ্রিত থাকে তবে দ্রবনে ঘোলা অধঃক্ষেপ পড়বে।

ভেজাল এমওপি সার সনাক্তকরণের পদ্ধতি

  • আধা চা চামচ এমওপি সার আধা গ্লাস পানিতে মিশালে সঠিক এমওপি সার সম্পূর্ণ দ্রবীভূত হয়ে পরিষ্কার দ্রবণ তৈরী করবে।
  • সারের নমুনায় কিছু অদ্রবনীয় বস্তু যেমন বালি, কাঁচের গুড়া, মিহি সাদা পাথর, ইটের গুড়া ইত্যাদি মেশালে তা তলানী আকারে গ্লাসের নীচে জমা হবে।
  • সারের নমুনায় লাল বা অন্য কোন রং মিশালে পানির রং সেই অনুযায়ী হবে এবং রং ভেসে উঠবে। এছাড়া হাতে রং লেগে যাবে। সঠিক এমওপি সারের রং কখনো হাতে লেগে যাবে না। (চিত্র-নিচে)

চিত্র- আসল ও ভেজাল এমওপি সার

ভেজাল জিপসাম সার সনাক্তকরণের পদ্ধতি

  • একটি কাঁচের বা চিনা মাটির পাত্রে ১ চা চামচ পরিমাণ জিপসাম সারের উপর ১০-১৫ ফোটা পাতলা (১০%) হাইড্রোক্লারিক এসিড আস্তে আস্তে মেশালে যদি বুদ বুদ দেখা দেয় তবে ধরে নেয়া যাবে যে জিপসাম সারের নমুনাটি ভেজাল।

ভেজাল দস্তা সার সনাক্তকরণের পদ্ধতি

জিংক সালফেট (হেপ্টা হাইড্রেট)

  • প্রকৃত জিংক সালফেট হেপ্টাহাইড্রেট দেখতে স্ফটিক আকৃতির এবং ঝুরঝুরে।
  • আধা গ্লাস ঠান্ডা পানিতে ১ চা চামচ জিংক সালফেট (হেপ্টা হাইড্রেট) দ্রবীভূত করলে প্রকৃত সারের নমুনা সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং পাত্রে কোনরূপ তলানী থাকবে না।
  • একই পরিমাণ জিংক সালফেট হেপ্টা হাইড্রেট সার জিংক সালফেট মনোহাইড্রেট সারের তুলনায় ওজনে অনেক হালকা।

জিংক সালফেট (মনো হাইড্রেট)

  • প্রকৃত জিংক সালফেট (মনো হাইড্রেট) সার দেখতে দানাদার।
  • আধা গ্লাস ঠান্ডা পানিতে ১-২ চা চামচ জিংক সালফেট ( মনো হাইড্রেট) সার দ্রবীভূত করলে সম্পূর্ণ গলবেনা এবং দ্রবণ ঘোলাটে হবে।
  • ম্যাগনেশিয়াম সালফেট দিয়ে তৈরী ভেজাল জিংক সালফেট (মনো) সার দেখতে ধবধবে সাদা।
  • ১-২ চা চামচ জিংক সালফেট (মনো হাইড্রেট) আধা গ্লাস পানিতে দ্রবীভূত করলে প্রাথমিকভাবে সমস্ত দ্রবণে পেজা তুলার মতো বস্তু ভাসতে থাকবে এবং পরবর্তীতে দ্রবণের উপরিভাগে একটি স্তর সৃষ্টি করবে।
  • এই দ্রবণে সোডিয়াম কার্বনেট বা সোডিয়াম বাই কার্বনেট (খাবার সোডা) মিশালে প্রথমে গাঢ় ঘোলাটে দ্রবণ তৈরী হবে। যদি নমুনাটি নির্ভেজাল জিংক সালফেট (মনো) হয় তাহলে গাঢ় ঘোলা দ্রবণটি ধীরে ধীরে গ্লাসের নীচ থেকে উপরে দিকে পরিষ্কার হতে থাকবে।
  • পক্ষান্তরে যদি নমুনাটি ভেজাল জিংক সালফেট (মনো) হয় তাহলে কিছুক্ষণ পর গাঢ় ঘোলাটে দ্রবণটির উপরের অংশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে গ্লাসের নিচের দিকে নামতে থাকবে। (চিত্র-নিচে)
  • এখানে ম্যাগনেশিয়াম সালফেট সোডিয়াম কার্বনেটের সাথে বিক্রিয়া করে সোডিয়াম সালফেটে রূপান্তরিত হয়ে পাত্রের নীচে অধঃক্ষেপ হিসেবে জমা হয়।

MgSO4+Na2CO3= MgCO3+Na2SO4

(অধঃক্ষেপ)

চিত্র- আসল ও ভেজাল জিংক সালফেট সার

চিলেটেড জিংকঃ

  • প্রকৃত চিলেটেড জিংক সার দেখতে মিহি স্ফটিক আকৃতির সাদা অথবা হলদেটে পাউডারের ন্যায় এবং ওজনে খুবই হালকা।
  • এক গ্লাস ঠান্ডা পানিতে আধা চা চামচ চিলেটেড জিংক মিশালে তাৎক্ষকিভাবে পানিতে দ্রবীভূত হবে।
  • এ সারে সালফার থাকে না বিধায় জলীয় দ্রবণে এক চিমটি বেরিয়াম ক্লোরাইড যোগ করলে কোন ঘোলা অধঃক্ষেপ পড়বে না।
  • ভেজাল চিলেটেড জিংক তাৎক্ষণিকভাবে পানিতে দ্রবিভূত হবে না এবং জলীয় দ্রবণে এক চিমটি বেরিয়াম ক্লোরাইড যোগ করলে ঘোলা অধঃক্ষেপ পড়বে। (চিত্র-নিচে)

চিত্র- আসল ও ভেজাল চিলেটেড জিংক সালফেট সার

ভেজাল বোরন সার সনাক্তকরণ পদ্ধতি

বোরণ সার (বরিক এসিড)

  • আধা গ্লাস পরিষ্কার ঠান্ডা পানিতে ১ চা চামচ বরিক এসিড দ্রবীভূত করলে প্রকৃত বরিক এসিডের নমুনা সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং গ্লাসের তলায় কোন প্রকার তলানী পড়বে না।
  • আধা গ্লাস পানিতে ১ চা চামচ পরিমাণ বরিক এসিড দ্রবীভূত করে এক চিমটি বেরিয়াম ক্লোরাইড মিশানো হলে যদি সারে নমুনাটি প্রকৃত বরিক এসিড হয় তবে দ্রবণে কোন অধঃক্ষেপ পড়বেনা। যদি নমুনাটি সোডিয়াম সালফেট দিয়ে তৈরী ভেজাল বরিক এসিড হয় তবে দ্রবণে বেরিয়াম সালফেটের অধঃক্ষেপ পড়বে এবং দ্রবণটি তাৎক্ষণিক ভাবে দুধের ন্যায় সাদা হয়ে যাবে।
  • বোরাক্স বা ম্যাগনেসিয়াম সালফেটের তুলনায় বরিক এসিডের স্ফটিক অনেক সুক্ষ এবং দেখতে শুষ্ক ও ঝুরঝুরে।

বোরণ সার (সলুবর)

  • সলুবর বোরণ দেখতে ধবধবে সাদা হালকা মিহি পাউডারের (Amorfos) মত।
  • আধা গ্লাস ঠান্ডা পানিতে ১ চা চামচ সলুবর দ্রবীভূত করলে প্রকৃত সলুবর সার সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং গ্লাসে কোনরূপ তলানী পড়বে না।
  • এক কেজি সলুবর বোরণ সারের প্যাকেট এক কেজি বরিক এসিড বা বোরাক্স সারের তুলনায় আকারে বড় হবে কারণ সলুবর ওজনে হালকা, তাই এক কেজি বরিক এসিডের প্যাকেটে সর্বোচচ আধা কেজি সলুবর সার রাখা যাবে।
  • আধা গ্লাস পানিতে ১ চা চামচ পরিমাণ সলুবর দ্রবীভূত করে এক চিমটি বেরিয়াম ক্লোরাইড মিশানো হলে যদি সারে নমুনাটি প্রকৃত সলুবর হয় তবে দ্রবণে কোন অধঃক্ষেপ পড়বেনা। যদি নমুনাটি সোডিয়াম সালফেট দিয়ে তৈরী ভেজাল সলুবর হয় তবে দ্রবণে বেরিয়াম সালফেটের অধঃক্ষেপ পড়বে এবং দ্রবণটি তাৎক্ষণিক ভাবে দুধের ন্যায় সাদা হয়ে যাবে। (চিত্র- নিচে)

চিত্র- আসল ও ভেজাল বোরন সার

তথ্যসূত্র: মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট।

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes