বৃহস্পতিবার , 21 নভেম্বর 2019

লবনাক্ত এলাকায় রবি ফসল চাষে ভূপৃষ্ঠস্থ পানি ব্যবহারের সম্ভাবনা

সাধারণতঃ বর্ষাকাল শেষ হওয়ার পর আশ্বিন হতে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত সময়কালে যে সব ফসল আবাদ করা হয় তাকে আমরা রবি ফসল বা শীতকালীন ফসল বলি। আশ্বিন-কার্তিক মাস রবি ফসল বোনার উপযুক্ত সময় এবং এ সময়ে যে সকল জমিতে জো আসে সে সকল জমিতে রবি ফসল বপন করা হয় । তবে উঁচু এলাকায় আশ্বিন মাসের পূর্বেই কিছু কিছু রবি ফসল বপন করা হয়। শুষ্ক মৌসুমে সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলা সমুহের উল্লেখযোগ্য একটা অংশে লোনা দেখা দেওয়ায় রোপা আমন ধান কাটার পর অধিকাংশ জমি পতিত থাকে। এ সকল এলাকায় মাটি ও পানিতে সাধারণত: নভেম্বর/ডিসেম্বর অর্থ্যাৎ অগ্রহায়ন/পৌষ মাস হতে লবনাক্ততা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং এপ্রিল/মে অর্থ্যাৎ চৈত্র/বৈশাখ মাসে মাটিতে লবনাক্ততার মাত্রা সবচেয়ে বেশী দেখা যায়। এ সময় মিষ্টি পানির অভাবে এ এলাকায় বোরোসহ প্রায় সকল রবি ফসলের আবাদ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে । কিন্তু মৌসুমের প্রথমে ভুপৃষ্ঠস্থ পানির লবনাক্ততা অপেক্ষাকৃত খুব কম থাকায় এ পানির সাহায্যে সেচ দিতে পারলে এ এলাকায় রবি ফসলের আবাদ বৃদ্ধি করা সম্ভব।

যে সকল কারণে লবণাক্ত এলাকায় ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা খুবই সীমিত সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ-
• ফসলের উপর লবণাক্ত মাটি ও পানির প্রভাব।
• সুষ্ঠু পানি ব্যবস্থাপনার অভাব অর্থাৎ সহজ কথায় বলতে গেলে লবণাক্ত মাটিতে সেচের পদ্ধতি কেমন হবে সে বিষয়ে অস্পষ্ট ধারণা।
• শুষ্ক মৌসুমে সেচের উপযোগী মিষ্টি পানির অভাব।
• মাটি হতে লবণাক্ততা দূরীকরণের যে সকল পদ্ধতি রয়েছে তার যথাযথ বাস্তবায়ন না করা।
• লবণাক্ত এলাকায় চাষাবাদ ও মাটির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অজ্ঞতা।
• উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা সহণশীল রবি ফসল সমহের আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি সংক্রান্ত গবেষণালব্ধ তথ্যের অভাব।
• জমি হতে রবি মৌসুমে দেরীতে পানি অপসারণ।

রবিশস্যকে আমরা আগাম,মধ্যবর্তীকালীন ও নাবী রবিশস্য হিসাবে ভাগ করে থাকি। আগাম রবিশস্য হিসাবে শাকসব্জি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, মুলা, গোলআলু, মিষ্টিআলু, বেগুন, মরিচ, মাষকলাই, সরিষা, তুলা উল্লেখযোগ্য । যে জমিতে ভাদ্র-আশ্বিন বা কার্তিক মাসের প্রথম দিকে জো আসে সে সব জমিতে আগাম রবিশস্য চাষ করা যেতে পারে।
মধ্যবর্তীকালীন রবিশস্যের মধ্যে রয়েছে গম, বার্লি, সরিষা, তিষি, মসুর, চীনাবাদাম, গোলআলু, মিষ্টিআলু, মরিচ,খেসারী,মাষকলাই,মুগ ও শাকসব্জি । যে সব জমি ১৫ই কার্তিক থেকে অগ্রহায়ণের শেষ নাগাদ জো আসে সেখানে মধ্যবর্তীকালীন রবিশস্যের চাষ বেশ উপযোগী।
নাবী রবিশস্যের মধ্যে রয়েছে সরগম, কাউন, চীনা, মরিচ, তরমুজ ও খিরা । যে জমিতে অগ্রহায়ণ মাসের পরে জো আসে এবং বৈশাখ মাসের পূর্বে প্লাবিত হয় না সেই সব জমিতে এ সকল ফসল আবাদ করা যেতে পারে।

লবনাক্ত এলাকায় যে সকল উপায়ে বোরো ধান চাষের জন্য মিষ্টি পানি সংগ্রহ করা যায় তার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হলো –

• অগভীর নলকুপ বসিয়ে মিষ্টি পানির ব্যবস্থা করা । এ ক্ষেত্রে পানির লবণাক্ততা পরীক্ষা করে নেয়া আবশ্যক, কারণ লবণাক্ত এলাকার অধিকাংশ অগভীর নলকুপের পানি লবণাক্ত হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে যা দিয়ে সেচ দিলে ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে ।।
• মজা খাল অথবা নালাগুলো সংস্কার করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা ।
• অলবণাক্ত নদী বা খালের পানি সেচ কাজে ব্যবহার করা ।

এ এলাকায় অপেক্ষাকৃত কম লবণাক্ত মাটি এবং খাল ও নালায় জমানো বৃষ্টির পানি বোরো ধানের জন্য উপযোগী। অলবণাক্ত অগভীর নলকূপের পানি দিয়েও বোরো ধান আবাদ করা সম্ভব, তবে এধরনের পানি সেচকাজে ব্যবহারের পূর্বে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। অগভীর নলকূপের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেশী হলে ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। এ ছাড়া নলকূপের সাহায্যে উঠানো পানি প্রথম প্রথম ২/১ বছর অলবণাক্ত থাকলেও পরে ধীরে ধীরে পানিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং ফসলের ক্ষতি করে। এ এলাকায় সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি নালা ও খালে জমিয়ে রেখে বোরো মৌসুমে সেচ কাজে ব্যবহার করা অপেক্ষাকৃত বেশী নিরাপদ। এছাড়া কিছু কিছু এলাকা রয়েছে যেখানে অগভীর নলকূপের সাহায্যেও কোন মিষ্ঠি পানির যোগান দেয়া সম্ভব নয়, ফলে এসকল এলাকায় ভূপৃষ্ঠস্থ পানি অর্থাৎ খাল অথবা নালায় জমানো বৃষ্টির পানি একমাত্র মিষ্টি পানির উৎস হতে পারে।
গরম হয়ে গেলে পানিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে, এক্ষেত্রে নালা কেটে পানি সরিয়ে পুনরায় সেচ দিতে হবে।
এ এলাকার মাটি ও পানিতে এপ্রিল/মে অর্থাৎ চৈত্র / বৈশাখ মাসে সবচেয়ে বেশী লোনা দেখা দেয়। এ সময়ের আগেই যাতে ধান পেকে যায় সেই মোতাবেক জমিতে বীজতলা তৈরী ও চারা রোপন করা উচিৎ ।
বি আর ১৪, ব্রি ধান ২৮,২৯, ও ভজন এ এলাকায় বোরো মৌসুমে আবাদ করা যেতে পারে। খাল অথবা নালায় জমানো বৃষ্টির পানি দিয়ে বোরো আবাদ করতে হলে কতটুকু পানি দিয়ে কতটুকু এলাকা চাষ করা সম্ভব সে দিকটা বিবেচনায় আনতে হবে। এছাড়া ধানের ফুল আসার সময় যাতে কোন মতেই পানির অভাব না হয় সেই মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া একাম প্রয়োজন। সুষ্ঠ পরিকল্পনা না থাকলে ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভবনা থাকবে। অগভীর নলকূপ দিয়ে সেচ দেয়া হলে প্রয়োজন বোধে সেচের পূর্বে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সকল জেলা অফিস অথবা খুলনাস্থ বটিয়াঘাটা উপজেলার লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনা ও গবেষণা কেন্দ্র হতে পানির লবণাক্ততা পরীক্ষা করিয়ে নেয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে স্থানীয় ব্লক সুপারভাইজারের সাথেও যোগাযোগ করা যেতে পারে।
অতি আগাম পানি অপসারিত জমি অর্থাৎ যে জমিতে বর্ষাকালে কোন সময়ে পানি দাঁড়ায় না এরুপ ঝুরঝুরে বা আলগা, সুনিষ্কাশিত বেলে দোআঁশ মাটিতে আগাম রবিশস্য যেমন-মুলা,মিষ্টিআলু,মরিচ,চাষ করা যেতে পারে।
• ঝুরঝুরে, সুনিষ্কাশিত দোআঁশ মাটিতে সেচবিহীন আগাম ও মধ্যবর্তীকালীন রবিশস্য,সেচযোগে আগাম রবি শাকসব্জি, গোলআলু, তুলা, তামাক, গম এবং শক্ত ও সামান্য মন্দ নিষ্কাশিত মাটিতে সেচযোগে বোরো করা যেতে পারে।
• আগাম পানি অপসারিত জমি অর্থাৎ কার্তিক মাসের মধ্যে যে জমিতে জো আসে এরুপ নিষ্কাশিত ঝুরঝুরে দোআঁশ ও এটেল দোআঁশ মাটিতে সেচবিহীন কিছু কিছু আগাম ও মধ্যবর্তীকালীন রবিশস্য,সেচযোগে মধ্যবর্তীকালীন বা দেরীতে পাকা রবিশস্য এবং মন্দ নিষ্কাশিত শক্ত এটেল মাটিতে সেচযোগে বোরো চাষ করা যেতে পারে।
• স্বাভাবিক সময়ে পানি অপসারিত জমি অর্থাৎ অগ্রহায়ণ মাসের মধ্যে যে জমিতে জো আসে এরুপ নিষ্কাশিত ঝুরঝুরে, দোআঁশ ও এটেল দোআঁশ মাটিতে সেচবিহীন মধ্যবর্তীকালীন রবিশস্য মিষ্টিআলু,চীনাবাদাম,ছোলা এবং শক্ত ও মন্দ নিষ্কাশিত এটেল দোআঁশ ও এটেল মাটিতে সেচবিহীন খেসারী এবং সেচযোগে ভুট্টা,গম,আলু ও বোরো করা যেতে পারে।
• দেরীতে পানি অপসারিত জমি অর্থাৎ অগ্রহায়ন মাসের পর জমিতে জো আসে এরুপ এটেল দোআঁশ ও এটেল, মন্দ নিষ্কাশিত ও শক্ত মাটিতে সেচবিহীন খেসারী ও সেচযোগে বোরো চাষ করা যেতে পারে।
• অলবণাক্ত ও অতি সামান্য লবণাক্ত মাটিতে প্রায় সব ধরণের রবিশষ্য আবাদ করা যায়।
• সামান্য ও মধ্যম লবণাক্ত মাটিতে তিল,মরিচ, মিষ্টিআলু,তুলা,সয়াবীন,তামাক,ব্রোকোলী, স্কোয়াশ, বার্লি, ফেলন,তরমুজ,সরগম, মুগ, বাজরা, কাউন, ছোলা,ধৈঞ্চা,কুসুমফুল ও সূর্যমুখীর আবাদ করা যেতে পারে।
• অধিক ও অত্যধিক লবণাক্ত এলাকায় তেমন কোন রবিশষ্যের চাষ করা যায় না বললেই চলে।
• পীট বা জৈব মাটির উপর ১০-১২ ইঞ্চি পলির আস্তরণ থাকলে বোরো আবাদ করা যেতে পারে।
• রবি ফসল আবাদের ক্ষেত্রে আবাদকালীন সময়ে মাটি বা সেচের পানি যাতে লবণাক্ত না হয়, সেচের বা বৃষ্টির পানি জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি বা বাড়ম ফসলের ক্ষতি না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখা দরকার। নির্বাচিত রবি ফসল আবাদের সময় পূর্ববর্তী ফসল যাতে জমি দখল করে না রাখে সেদিকে আগে থেকেই খেয়াল রাখতে হবে।

অতএব উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা এবং ভূমি ও মাটির বৈশিষ্ট অনুযায়ী রবি ফসল নির্বাচনের মাধ্যমে এ অঞ্চলে বিস্তীর্ণ অনাবাদী এলাকা চাষের আওতায় আনতে পারলে দেশে কৃষি উৎপাদন বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়।

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes